রবিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১২

ইন্টারভিউ? ভয় কিসের!

সাধারণ পরীক্ষা কিংবা চাকরি পাওয়ার পরীক্ষা, যাই হোক না কেন, সার্বিক সাফল্য নির্ভর করে ভাল উত্তর লেখার পাশাপাশি ভাল ইন্টারভিউ দেওয়ার উপরেও। কিন্তু ভাল উত্তর লেখা আর ইন্টারভিউ বোর্ডের তীক্ষ্ম প্রশ্নের সামনে সফল হওয়া এক নয়। সত্যি কথা বলতে কী, অনেক বাঘা-বাঘা ছাত্রও ইন্টারভিউ-এ বসতে যথেষ্ট শঙ্কিত হয়ে পড়ে।
কিন্তু ইন্টারভিউকে এত ভয় পাবেন কেন? যে উত্তরটা খাতায়-কলমে ক্র্যাক করতে বিন্দুমাত্র সময় লাগে না, সেটার সামনাসামনি হলে কুপোকাত অনেকেই। তা হলে যারা ভয়ে ভয়ে ইন্টারভিউ বোর্ডের সামনে হাজিরা দেয়, তাদের কি কোন আশাই নেই? আছে, নিশ্চয়ই আছে। স্ট্র্যাটেজি বদলে ফেললেই দেখবে, ইন্টারভিউ হল একটি পজিটিভ এক্সপেরিয়েন্স।
ইন্টারভিউ-এর দিন
ইন্টারভিউ এর প্রধান উদ্দেশ্য হল সশরীরে প্রার্থীকে বিচার করা। টেবিলের ওপারের লোকগুলি কিন্তু ঠিক তোমার জ্ঞানকে তলিয়ে মাপতে বসেননি, সেসব মাপামাপির কাজ শেষ হয়ে গিয়েছে লিখিত পরীক্ষার সঙ্গেই। সেখানে তুমি ভাল ফল করতে পেরেছেন বলেই আপনাকে ডাকা হয়েছে ইন্টারভিউ-এ, অকারণে আপনাকে হ্যারাস করতে নয়। অতএব, ‘আমি এগিয়ে থেকেই শুরু করছি এবং বাকি সাফল্যটুকু অর্জন করতে আমি পুরোপুরি সক্ষম’, এই কথাটা মাথায় রাখলে ইন্টারভিউ রুমে ঢোকার সময়ে দেখবে পা ভারি লাগছে না। ইন্টারভিউ পর্বে আপনাকে ডাকা হয়েছে শুধু আপনার পার্সোনালিটি পরীক্ষা করার জন্য। আপনি মানুষটা কেমন, আপনার হাঁটাচলা, অ্যাটিচিউড, চিন্তা-ভাবনার ধরন, মতামত ইত্যাদি জানতে। ইন্টারভিউ বোর্ডের সামনে নিজের অ্যাড্রিনালিন রাশকে নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। সামনে হয়তো বসে আছেন বেশ কিছু হোমরাচোমরা ব্যক্তিত্ব, বেশ কয়েকজোড়া চোখ আপনার প্রত্যেকটি পদক্ষেপকে মাপছে, এই অবস্থায় নার্ভাস হলে চলবে না। কারণ, যত নার্ভাস হবে, ততোই তোমার সাফল্য লাভের সম্ভাবনা কমবে। কারণ, সেক্ষেত্রে ওই হেভিওয়েটরা নয়, আপনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে আপনি নিজেই। ঘুরে ঢুকে সকলকে অভিবাদন জানান, বিনয়ের সঙ্গে এবং চোখে চোখ রেখে কথা বলেন। অপেক্ষা করেন বোর্ড মেম্বাররা আপনাকে বসতে বলা পর্যন্ত এবং সবার আগে ধন্যবাদ জানাতে ভুলে যাবেন না। বসার পরে অপেক্ষা করো অন্যদিক থেকে কী প্রশ্ন আসে, তার জন্য। সাধারণত প্রথমে নামধাম, কী নিয়ে পড়াশোনা করেছেন, ক্যারিয়ারে লক্ষ্য কী, সেটা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। এই অপেক্ষাকৃত সহজ প্রশ্নগুলির উত্তর দেওয়ার সময় নিজের মানসিক ধৈর্য বাড়ানোর চেষ্টা করবেন। কারণ, এরপর যখন বড় প্রশ্নগুলি উড়ে আসবে একে-একে, তখন মাথা ঠান্ডা করে, প্রশ্নকর্তার চোখে চোখ রেখে স্বতঃস্ফূর্ত উত্তর দেওয়া জরুরি। উত্তর দেওয়ার সময়ে একটা কথা মাথায় রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেটা হল, ইন্টারভিউয়ের সব প্রশ্নই যে একই মানের হবে এবং সেগুলি আপনার জানা প্রশ্ন, তা কিন্তু নয়। এক্ষেত্রে ধরাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে, উত্তর দিতে। যেটা জানেন, সেটা অতিরিক্ত বেশি বলা বা যেটা তেমন জানেন না, সেটার উত্তর বানিয়ে বানিয়ে বলার পথটি কিন্তু আত্মঘাতি। উত্তর অজানা থাকলে তা সবিনয়ে স্বীকার করে নেওয়াই উচিত। তাছাড়া, কোন ব্যাপারে মতামত চাইতে বললে, সেটার উপরে ‘এমনটা হওয়া উচিত’ গোছের মন্তব্য করা শ্রেয় নয়। বিনম্রভাবে শুধু নিজের দৃষ্টিভঙ্গি পেশ করতে পারলে ইন্টারভিউ বোর্ডের সামনে এবং সেই মতামত যেন যথেষ্ট ভাবনাচিন্তা প্রসূত এবং যুক্তপূর্ণ হয়। নিজের পেশাগত বিষয়ের উপর সম্যক জ্ঞান এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি এবং ঘটনাপ্রবাহ সম্বন্ধে যথেষ্ট ঠান্ডা থাকা জরুরি। বক্তব্য পেশ করার ক্ষেত্রে যেন পরিচ্ছন্নতা থাকে। তবে প্রশ্নকর্তা তার প্রশ্ন শেষ করার আগেই কথা বলতে শুরু করা সৌজন্যহীনতার পরিচয়। আগে অন্যের কথা শেষ করতে দিন, তারপর নিজে বলবেন। অযথা নিজেকে জাহির করার কিংবা উত্তেজনা প্রকাশ করার কোনও দরকার নেই। কোনও ব্যাপারে যদি মনে হয় প্রশ্নকর্তা ভুল বলছেন এবং আপনি তার সঙ্গে কোনওভাবেই একমত নন, তা হলে তা নম্রভাবে প্রকাশ করবেন। কোনো মতেই পাল্টা চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ফেলবেন না। কে জানে, তিনি হয়তো জেনেবুঝেই আপনাকে ভুল বলছেন, শুধু আপনার টেম্পারমেন্ট পরীক্ষা করার জন্য। অতএব, রেগে গেলে কিংবা উত্তেজিত হলে তা আপনারই পরাজয়। ইন্টারভিউ আদতে একটা সাইকোলজিক্যাল খেলা। প্রশ্নকর্তারা যেমন আপনাকে নানা প্রশ্নে বিদ্ধ করার চেষ্টা করবেন, আপনাকেও একইভাবে চেষ্টা করতে হবে যাতে পরিবেশ, পরিস্থিতি আপনার অনুকূলে আসে। সেজন্য সোজা পথ একটাই, দুর্দান্ত একটা ফার্স্ট ইম্প্রেশন জমিয়ে ফেলা।
আপনার যা বলার আছে
ইন্টারভিউয়ে আপনাকেও প্রশ্ন করার বা কিছু জানার যথেষ্ট সুযোগ দেওয়া হবে। এই অংশটিও কিন্তু ইন্টারভিউ-এর মধ্যেই পড়ে। তাই বাক্‌স্বাধীনতা থাকলেও তা প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে একটু স্ট্র্যাটেজিক্যাল হওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, যে চাকরির জন্য ইন্টারভিউতে বসছেন, সেটা সম্বন্ধে আপনার যে যথেষ্ট আগ্রহ রয়েছে, তা যেন আপনার হাবেভাবে প্রকাশ পায়। ‘দৈনিক কত ঘন্টা কাজ’, ‘শনিবার ছুটি কিনা’, (রবিবার ছুটি ধরে নেওয়া যেতে পারে) বা ‘টিফিন আওয়ার্স কতক্ষণ?’ ইত্যাদি প্রশ্নের মাধ্যমে যেন কোনোরকম অপেশাদার মনোভাবের পরিচয় প্রকাশ না পায়। বোঝাতে হবে যে, আপনি টিম স্পিরিটে বিশ্বাসী এবং সংস্থার প্রতি আপনার কমিটমেন্ট রয়েছে পুরোপুরি। ধরেন, এটি আপনার দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় চাকরি এবং আপনার সিভি’তে লেখা রয়েছে যে, আপনি খুব তাড়াতাড়ি আগের চাকির বদল করেছেন, এটা কিন্তু অনেক সময়ে নেগেটিভ বার্তা পৌঁছে দিতে পারে ইন্টারভিউয়ারদের কাছে। সেজন্য এই প্রসঙ্গে আগেভাগে প্র‘তি নেওয়া জরুরি। এ ব্যাপারে প্রশ্ন উঠলে ইন্টারভিউয়ারদের বোঝাতে হবে যে, আপনি এই চাকরিতে দরখাস্ত করেছেন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবেই, কারণ ক্যারিয়ার গড়তে আপনার এই বিশেষ চাকরিটি অনেক দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। বেতন, ছুটি কিংবা পোস্টিং-এর মতো বিষয়ে কোন খুঁতখুঁতে মনোভাব প্রকাশ না করাই বাঞ্ছনীয়। প্রত্যাশিত বেতন জানতে চাওয়া হলে তা কাজের পদ, দায়িত্বের পরিমাণ ইত্যাদির সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই বলা উচিত। কোনও অবিশ্বাস্য অঙ্ক বলা উচিত নয়। এক্ষেত্রে ঠিকঠাক হোমওয়ার্ক করে নিলে অসুবিধে হওয়ার কথা নয় (এই পদে অন্যান্য জায়গায় লোকে কত মাইনে পাচ্ছে, সেটা আগেভাগে জেনে রাখা উচিত)।
কী করবেন না
১. যথেষ্ট প্রস্তুতি ছাড়া ইন্টারভিউতে বসা।
২. যা খুশি পোশাকআসাক পরা।
৩. বেশি আগে বা পরে ইন্টারভিউ হলে উপস্থিত হওয়া।
৪. দরকারের বেশি কথা বলা।
৫. আগের কোম্পানির বস কিংবা ম্যানেজারের নামে বদনাম করা।
৬. অস্পষ্ট এবং কোনরকম অশালীন ভাষা ব্যবহার করা।
৭. টেলিফোনিক ইন্টারভিউ-এর ক্ষেত্রে গলার স্বর এবং কথা বলার ধরন গুরুত্বপূর্ণ। তাই কথা বলার সময়ে মুখে খাবার বা চুইয়িংগাম থাকা সৌজন্যহীনতার পরিচয়।
৮. ইন্টারভিউ দিয়ে বেরিয়ে আসার সময়ে রুক্ষ মনোভাব দেখানো।
ইন্টারভিউয়ের কিছু প্রশ্ন (চাকরির পরীক্ষাসহ)
১. নিজের সম্বন্ধে কিছু বলা।
২. আপনার দুর্বলতা কী?
৩. কেন আমরা আপনাকে এই চাকরিতে জয়েন করতে দেব?
৪. কাল যদি আপনি অন্য জায়গা থেকে ভাল অফার পান, তাহলে কী করবেন?
৫. আজ থেকে পাঁচ-সাত বছর পরে আপনি নিজেকে কোথায় দেখতে চান?
ইন্টারভিউয়ারকে আপনি কী প্রশ্ন করবে? (চাকরির পরীক্ষাসহ)
১. আপনাদের কোম্পানি সম্বন্ধে জানতে চাই। আপনাদের কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য কী?
২. আমার ক্যারিয়ার লক্ষ্য আপনাদের জানিয়েছি। সংশিস্নষ্ট চাকরিটি আমার ক্যারিয়ার গড়ার ক্ষেত্রে কতটা সাহায্য করবে? দায়দায়িত্ব কী? প্রোমোশনের সম্ভাবনা কীরকম?
৩. আপনাদের কোম্পানিতে আমি কী কী ধরনের পেশাগত ট্রেনিং নিতে পারবো?
৪. আমার সম্ভাব্য সিটিসি (কস্ট টু কোম্পানি) কত হতে পারে? এক্ষেত্রে ইন্টারভিউয়ারও প্রশ্ন করতে পারেন যে, আপনার প্রত্যাশিত সিটিসি কত? কস্ট টু কোম্পানি অর্থে, মাইনে ছাড়াও অন্যান্য সুযোগসুবিধা বাবদ এই সংস্থা তার কর্মীদের পিছনে কত খরচ করছে?
সব মিলিয়ে ঠিকমতো পরিকল্পনা এবং প্র‘তি নিলে পৃথিবীর কঠিন থেকে কঠিনতম ইন্টারভিউ টপকানোও অসম্ভব নয়। পজিটিভ মাইন্ডসেট এবং অপটিমিস্টিক অ্যাটিচিউড থাকাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এরপর যখন লিখিত পরীক্ষায় পাস করে ইন্টারভিউয়ের ডাক আসবে, তখন মনে রাখতে হবে একটাই, অর্ধেক যুদ্ধ জিতে গিয়েছি, বাকিটাও এবার জিতব!
টি টিপস
ইন্টারভিউয়ের আগের দিন রাতজাগা উচিত নয়। ইন্টারভিউ শুরু হওয়ার সময়ের অন্তত আধঘন্টা থেকে পঁয়তাল্লিশ মিনিট আগে রিপোর্ট করেন নির্দিষ্ট স্থানে। সঙ্গে রাখেন ইন্টারভিউ লেটারসহ যে সমস্ত ডকুমেন্ট চাওয়া হয়েছে। সঙ্গে এক কপি সিভি থাকলে ভাল।
পোশাকের দিকে নজর দেওয়া মাস্ট। ফর্মাল্‌স তো অবশ্যই, পোশাকের কালার কম্বিনেশন হওয়া উচিত যথাযথ। হালকা রঙের ফুল িভস শার্ট (অবশ্যই হাতা গুটিয়ে নয়) এবং ডার্ক ট্রাউজারস পড়াই শ্রেয়। ফর্মাল জুতোজোড়াও যেন অবহেলিত না থাকে।
ইন্টারভিউয়ে বসে অতিরিক্ত কথা বলা অনুচিত। বেশি কথা বললে উত্তরের ফোকাসটা বিঘ্নিত হবে এবং পাশাপাশি আপনার ইম্প্রেশনেরও একেবারে চোদ্দটা বাজবে।
‘আপনার দুর্বলতা কী?’ বা ‘আজ থেকে পাঁচ বছর পর তুমি কোথায় নিজেকে দেখতে চাও?’ গোছের প্রশ্নে হতভম্ব হয়ে পড়ার কারণ নেই। এগুলির সাহায্যে আপনার আত্মসমীক্ষা কিংবা দুরদৃষ্টি বা অধ্যাবসায় কতটা মজবুত, সেটাই পরীক্ষা করেন প্রশ্নকর্তারা। এই প্রশ্নের উত্তর বুদ্ধি করে দিলে ভাল। আর যদি সেরকম কিছু মাথায় আসছে না মনে হয়, তা হলে সোজাসাপ্টা সরল উত্তর দেওয়াই নিরাপদ।
কোনও প্রশ্নকর্তার ব্যবহার যদি যথেষ্ট ইতিবাচক না হয়, আপনাকে যদি কেউ সরাসরি বলেও দেন যে, আপনি সেই অর্থে সঠিক চাকরির ইন্টারভিউয়ে আসোনি বা আপনাকে চাকরি দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ, বিশেষ কোনও একটি স্কিল আপনার মধ্যে নেই, তা হলে কিন্তু আপনি হতাশ হয়ে যাবেন না বা মাথা গরম করে ফেলবেন না। কারণ, এটাই শেষ সুযোগ নয়। সব পরিস্থিতি হাসিমুখে সামলাতে জানতে হবে।
Previous Post
Next Post
Related Posts