বুধবার, ১৩ জুলাই, ২০১১

শূন্য থেকেও শুরু করা যায় (ফিলিপ কটলার )

বিশ্বব্যাপী বিপণণ-গুরু নামে খ্যাত ফিলিপ কটলারের জন্ম ১৯৩১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে। ক্যামব্রিজ মার্কেটিং কলেজের মার্কেটিং-বিষয়ক এক বিতর্ক প্রতিযোগিতার সমাপনী অনুষ্ঠানে ১৯৯৭ সালের ৭ আগস্ট ফিলিপ কটলার শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে এই বক্তৃতা দেন

সবাইকে প্রথমেই ধন্যবাদ জানাই। যুক্তরাজ্যের মার্কেটিং শেখার সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান ক্যামব্রিজের একঝাঁক মেধাবী বিতার্কিক, শিক্ষার্থী এবং সেই সঙ্গে সম্মানিত শিক্ষকেরা আজ আমার বক্তৃতা শোনার জন্য আমার সামনে অপেক্ষা করছেন, ভাবতেই ভালো লাগছে। এত বেশি মানুষের সামনে কথা বলতে পারার সুযোগ পাওয়াটা সত্যিই অতুলনীয়।
ভালো যেমন লাগছে, সেই সঙ্গে আরেকটা কথাও মনে পড়ে যাচ্ছে। সে অনেক দিন আগের কথা। আমি আমার জীবনের প্রথম বক্তৃতা করতে গিয়েছিলাম আমেরিকান একটি বিপণন-প্রতিষ্ঠানে। ওখানে গিয়ে আমি অনেকটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিলাম। কারণ, আমার সামনে দর্শকসারিতে মাত্র একজন বসে বসে আমার কথা শুনছিলেন। হাস্যকর হলেও সত্যি যে সেই অবস্থায়ও মাইকে কথা বলে যাচ্ছিলাম আমি। হাজার হলেও আমার জীবনের প্রথম বক্তৃতা বলে কথা! তা যা-ই হোক, আমার জন্য তখনো আসলে আরও বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। আমি আমার বক্তৃতা শেষ করে যেই না হল ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া শুরু করেছি, অমনি আমার সামনে বসে থাকা সেই দর্শক আমাকে থামালেন। ‘আপনি এখন যেতে পারবেন না!’ আমি তো আশ্চর্য। জানতে চাইলাম, কেন যেতে পারব না? তখন তিনি আমাকে যা বললেন, তা শুনে আমি হাসব না কাঁদব, ভুলে গেলাম। আপনারা কি জানেন, তিনি আমাকে কী বলেছিলেন? তিনি বলেছিলেন, ‘আপনি যেতে পারবেন না, কারণ, আপনার পরে আমার বক্তৃতা দেওয়ার কথা। আপনি চলে গেলে আমার বক্তৃতা শুনবে কে?’
যা-ই হোক, আজ যে সে রকম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হলো না, তা ভেবে বেশ ভালোই লাগছে। ক্যামব্রিজ মার্কেটিং কলেজের মতো জায়গায় মার্কেটিং-সম্পর্কিত আমার নিজের কিছু ধ্যান-ধারণা তোমাদের সঙ্গে শেয়ার করে নিতে আমার খুব ভালো লাগবে।
প্রথমেই বলব চলমান বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মার্কেটিংকেও এগিয়ে যেতে হবে। কোনো নতুন ব্যবসা শুরু করার জন্য এখন আর অঢেল সম্পত্তির দরকার হয় না। একেবারে শূন্য থেকেও তা শুরু করা যায় নিজের মধ্যে মার্কেটিংয়ের কিছু বিশেষ গুণাবলি থাকলে। এ ক্ষেত্রে আউটসোর্সিং কাজ করে ম্যাজিকের মতো। আমি এখন নিউইয়র্কের একজন ভদ্রলোকের কথা শোনাব তোমাদের। তিনি একদিন নিউইয়র্কের এক বড় ফ্যাশন হাউসে একটা সুন্দর সোয়েটার নিয়ে গেলেন। ওখানে গিয়ে তিনি মালিকপক্ষকে জানালেন, তিনি এ রকম ভালো মানের আরও অনেক সোয়েটার তাদের দিতে পারবেন মাত্র ১০ ডলার দরে। আর ফ্যাশন হাউসগুলো তাদের ক্রেতাদের কাছে তা ২৫ থেকে ৩০ ডলারে বিক্রি করতে পারবে। সেই ফ্যাশন হাউস ভদ্রলোকের এই শর্তে রাজি হয়ে গেল। এবার লোকটি সোয়েটারের নির্মাতা হংকংভিত্তিক একটি গার্মেন্টসে যোগাযোগ করে মাত্র সাত ডলার মূল্যে অনেকগুলো সোয়েটারের অর্ডার দিলেন। তারপর একটি জাহাজ কোম্পানিতে সোয়েটারগুলো নিউইয়র্কে সরাসরি ফ্যাশন হাউসে চালান দেওয়ার অর্ডার দিলেন। এভাবেই সেসব মালামাল পৌঁছে গেল জায়গামতো। মাঝখান থেকে ভদ্রলোক কিছু অর্থ উপার্জন করলেন। এমনকি ওই সব মালামাল রাখতে কোনো গুদাম ভাড়া করার খরচও দরকার হলো না ওই ভদ্রলোকের।
তোমরা সবাই কমবেশি ‘নাইকি’র নাম শুনেছ। ‘নাইকি’ কী করে জানতে চাইলে তোমরা হয়তো সবাই বলবে, নাইকি বিশ্বমানের উন্নত জুতা তৈরি করে। কিন্তু আমি যদি বলি, না। নাইকি কোনো জুতা তৈরি করে না। সত্যিই নাইকি কোনো জুতা তৈরি করে না। নাইকির জুতা তৈরির কোনো কারখানা নেই বিশ্বের কোথাও। তারা শুধু উন্নত মানের জুতার নকশা বানায় তাদের ল্যাবে। এরপর সেগুলো সঠিকভাবে বিপণন করে বিশ্বব্যাপী। কী! আশ্চর্য হচ্ছো তো? এটাই তো আসলে আউটসোর্সিংয়ের নিয়ম। তুমি একটা কিছু তৈরি করতে পারো যে খরচে, তার চেয়ে অনেক কম খরচে আরেকটি কোম্পানি যদি সেই একই জিনিস তৈরি করতে পারে, তাহলে আমার প্রশ্ন হলো, কেন তুমি বেশি খরচ করে সেই জিনিসটা বানাবে? তুমি তো তাদের কাছ থেকে সেই জিনিসটা কিনে নিয়ে বিপণন করলেই পারো। অর্থাৎ তোমার কোনো বড় কারখানা লাগবে না, অনেক বেশি টাকা-পয়সার প্রয়োজন হবে না। শুধু সুন্দর সময়োপযোগী বিপণনব্যবস্থা জানলেই চলবে।
তবে মনে রেখো, মার্কেটিং মানে শুধু ব্যবসা করে মুনাফা অর্জন নয়, ক্রেতারা কী চায়, কীভাবে চায়, কেন চায়, ক্রেতারা তাদের পয়সা ঠিকভাবে উসুল করতে পারছে কি না, তা নিশ্চিত করাও তোমাদের দায়িত্ব। ইউরোপের একটা এয়ারলাইনসের কথা বলি। সাউথ ওয়েস্ট এয়ারলাইনসের স্লোগান হলো, ‘লেস ফর মাচ লেস!’ (কম সেবা আরও অনেক কম দামে!)। বিষয়টা খুলেই বলি। আমরা বিমানে ভ্রমণের সময় প্রকৃত ভাড়ার চেয়ে অনেক বেশি ভাড়া গুনতে হয় বিমানে পরিবেশিত খাবারের জন্য, এয়ার হোস্টেসের সহযোগিতার জন্য, মালপত্র রাখতে কেবিন ক্রুদের সাহায্যের জন্য, টিভি দেখার জন্য বা গান শোনার জন্য। এখন তুমি যদি ভ্রমণের সময় খাবার খেতে না চাও, টিভি দেখতে না চাও, নিজের মালামাল নিজের কাছেই গুছিয়ে রাখতে চাও নিজ দায়িত্বে, আর এর বিনিময়ে ওসব বাবদ বিবিধ চার্জ বাদ দিয়ে কম ভাড়ায় যেতে চাও, তাহলে তা কি সম্ভব? অন্য কোথাও সম্ভব না হলেও সাউথ ওয়েস্ট এয়ারলাইনসের বিমানে তা সম্ভব। এই বিমানে তুমি শুধু ভ্রমণ করতে পারবে। কোনো খাবার পরিবেশিত হবে না, গান শোনা, টিভি দেখা যাবে না, নিজের ব্যাগ নিজেকেই রাখতে হবে, এয়ার হোস্টেস থাকবে না। কিন্তু ভাড়া অন্য যেকোনো এয়ারলাইনসের তুলনায় অর্ধেক! এই গল্প থেকে আমরা শিখতে পারি যে গ্রাহককে কোনো কিছু যেকোনোভাবে গছিয়ে দেওয়াটা মার্কেটিংয়ের উদ্দেশ্য নয়। সঠিক নীতি বজায় রেখে সুষ্ঠু বিপণন করেও সফল হওয়া যায়।
আর বেশি কথা বাড়াতে চাই না। আমরা কেউ আসলে সঠিকভাবে জানি না যে আমরা আসলে বিপণনকর্মীরাই (মার্কেটিয়াররা) কি বিভিন্ন ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানকে সফলতার শীর্ষে নিয়ে গেছি, নাকি ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি এবং চরম প্রতিযোগিতামূলক বাজার এই কৃতিত্বের দাবিদার? কারণটা যা-ই হোক না কেন, তোমাদের মানে ভবিষ্যৎ বিপণনকর্মীদের বড় দায়িত্ব হলো, মার্কেটিংয়ের নৈতিকতা সঠিকভাবে অনুসরণ করে বিশ্বব্যাপী আরও নতুন বিপণনক্ষেত্র (বাজার) সৃষ্টি করা। ধন্যবাদ তোমাদের সবাইকে।
Previous Post
Next Post
Related Posts

0 comments: